ঢাকা | বঙ্গাব্দ

বিয়াম ফাউন্ডেশন: ৯ কোটি টাকা লোপাটের নথি পোড়াতে গিয়ে আগুনে মৃত্যু

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 19, 2026 ইং
বিয়াম ফাউন্ডেশন: ৯ কোটি টাকা লোপাটের নথি পোড়াতে গিয়ে আগুনে মৃত্যু ছবির ক্যাপশন: ছবি: সংগৃহীত
ad728
বিশেষ প্রতিবেদক: 
রাজধানীর ইস্কাটনের বিয়াম ফাউন্ডেশন ভবনে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকান্ডে দু’জনের মৃত্যুর ঘটনার নেপথ্যে ছিল প্রায় ৯ কোটি টাকা আত্মসাতের তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা। এর মূল পরিকল্পনাকারী বিসিএস (প্রশাসন) কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতির প্রশাসনিক কর্মকর্তা এস এম জাহিদুল ইসলাম। তিনি নিজের অপকর্ম আড়াল করতে হিসাব-সংক্রান্ত নথি পুড়িয়ে ফেলার জন্য পুরো ঘটনার প্ল্যানিং সাজান। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) তদন্তে উঠে এসেছে এমন তথ্য।
পিবিআই বলছে, জাহিদুল চেয়েছিলেন, টাকা আত্মসাতের বিষয়টি যেন হিসাবরক্ষকের নজরে না আসে এবং উল্টো তাঁকেই ফাঁসানো যায়। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তিনি চাকরিচ্যুত সেনাসদস্য আশরাফুল ইসলাম, অফিস সহায়ক আব্দুল মালেক ও গাড়িচালক ফারুক মীরকে এ কাজে ব্যবহার করেন। এ ঘটনায় সম্প্রতি জাহিদুল ও আশরাফুলের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পিবিআই।
বিস্ফোরণ ও অগ্নিকান্ডের বিষয়ে হাতিরঝিল থানায় করা মামলাটি প্রথমে তদন্ত করেন এসআই খন্দকার সালেহ আবু নাঈম। পরে এটি পিবিআই ঢাকা মহানগরের বিশেষায়িত তদন্ত ও অভিযান (সংঘবদ্ধ অপরাধ-উত্তর) ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়।
সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইর এসআই মোহাম্মদ গোলাম মওলা বলেন, বিয়ামের সমবায় সমিতির ৯টি ব্যাংক হিসাব রয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে সেখানে চাকরির সুবাদে জাহিদুল ইসলাম সব হিসাব নম্বরে লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সমিতির কমিটি বছর বছর পরিবর্তন হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আগের হিসাবের বিষয়ে তেমন খোঁজ রাখতেন না। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রায় ৯ কোটি টাকা সরিয়ে ফেলেন ওই কর্মকর্তা। তিনি ব্যাংক হিসাবের ‘সিগনেটরি অথরিটি’র স্বাক্ষর জাল করে টাকা তুলে নেন। সেই টাকায় তিনি ঢাকায় পাঁচ কাঠার প্লট এবং অন্যত্র ২১ বিঘা জমি কেনেন। 
তিনি আরও বলেন, সমিতির হিসাবরক্ষক মমিনুর রহমান এর আগে চার লাখ টাকার গড়মিল ধরে ফেলায় তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন জাহিদুল। তাই তিনি হিসাবের কারসাজির নথি পুড়িয়ে মমিনুরকে ফাঁসানোর পরিকল্পনা করেন।
গত বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাত ৩টা ২০ মিনিটের দিকে বিয়াম ফাউন্ডেশনের ৫০৪ নম্বর কক্ষে সমবায় সমিতির অফিসে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে সমিতির দলিল, নামজারির কাগজ, জমি কেনার চুক্তিপত্র, ব্যাংক হিসাবের চেকবই, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, আসবাব এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্র পুড়ে যায়। 
এ ঘটনায় সেখানেই পুড়ে মারা যান অফিস সহায়ক আব্দুল মালেক। দগ্ধ গাড়িচালক ফারুক চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। প্রাথমিকভাবে এ ঘটনাকে এসি বিস্ফোরণ বলে ধারণা করেন তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা।  
পিবিআইর তদন্ত সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন একই পদে থাকায় সমিতির বিভিন্ন কার্যনির্বাহী কমিটির অভ্যন্তরীণ বিষয়, সদস্যদের আর্থিক লেনদেন এবং হিসাব-নিকাশ সম্পর্কে জাহিদুলের বিস্তারিত ধারণা ছিল। বিভিন্ন কাজে সমিতির সদস্য ও কর্মকর্তারা তাঁর কাছে টাকা দিতেন। 
এসব অর্থের একটি অংশ ব্যাংকে জমা না দিয়ে এবং কিছু ক্ষেত্রে স্বাক্ষর জাল করে টাকা তুলে তিনি আত্মসাৎ করেন। পিবিআই তদন্তের একপর্যায়ে জাহিদুল ইসলাম ও আশরাফুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তাদের জবানবন্দি নেওয়া হয়। বর্তমানে জাহিদুল জামিনে এসে পলাতক এবং আশরাফুল জামিনে রয়েছেন।
আশরাফুলকে ১২ লাখ টাকার প্রস্তাব
তদন্তে বলা হয়েছে, জাহিদুল প্রথমে তাঁর পরিচিত আশরাফুল ইসলামকে পরিকল্পনার কথা জানান। এ কাজে সহযোগিতার বিনিময়ে তাঁকে ১২ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরে আশরাফুল কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন এবং কয়েক মাস মগবাজারের একটি হোটেলে জাহিদুলের খরচে থাকেন। তিনি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আব্দুল মালেককে যুক্ত করেন। মালেককে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলে রাজি করানো হয়। মালেক জানান, ফারুকের সহায়তা প্রয়োজন। পরে ফারুককে তিন লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করা হলে তিনিও রাজি হন। মালেক ও ফারুক দুজনেই রাতে অফিসে থাকতেন।
সিসিটিভি বন্ধের পরিকল্পনা
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ৫০৪ নম্বর কক্ষের সামনে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরা পুরো তলা পর্যবেক্ষণ করত। এ কারণে আগেই সিসিটিভি বন্ধ করার পরিকল্পনা করা হয়। মালেক সিসিটিভি কীভাবে বন্ধ করতে হয় তা আশরাফুলকে শেখান। আগুন দেওয়ার জন্য পেট্রোল ও লাইটার আগেই কিনে রাখা হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে আশরাফুলকে কাপড়, টুপি, মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভস কেনার জন্য জাহিদুল চার-পাঁচ হাজার টাকা দেন। রাত আড়াইটার দিকে ফারুক তাঁকে বিয়াম ভবনে নিয়ে যান।
সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার বরাত দিয়ে তদন্তে বলা হয়েছে, রাত ২টা ৩৪ মিনিটের দিকে লিফট বন্ধ থাকায় আশরাফুল সিঁড়ি দিয়ে চতুর্থ তলায় যান। ২টা ৩৬ মিনিটের দিকে তিনি সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ করেন। 
এরপর মালেক ও ফারুকের সঙ্গে তাঁর কথা হয়। পরে তিনজন মিলে ৫০৪ নম্বর কক্ষে ঢুকে বিভিন্ন স্থানে পেট্রোল ছিটিয়ে দেন। তখন আশরাফুলকে দরজার সামনে পাহারায় দাঁড়াতে বলা হয়। মালেক ও ফারুক লাইটার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন।
আগুন, বিস্ফোরণ ও মৃত্যু
আগুন লাগার পর মুহূর্তের মধ্যে কক্ষের কাগজপত্র ও আসবাবে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। কক্ষে থাকা এসিতে আগুন ধরে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে মালেক ও ফারুক দগ্ধ হন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আশরাফুল সেখান থেকে পালিয়ে দোতলার একটি কক্ষে আশ্রয় নেন। পরে নিজের পরনের পোশাক, টুপি ও হ্যান্ডগ্লাভস সেখানে রেখে রাত ৪টা ৪০ মিনিটের দিকে ভবন থেকে বের হয়ে যান।
অন্যদিকে ফারুক অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় কক্ষ থেকে বের হয়ে ৫০৭ নম্বর কক্ষে যান। পরে ভবনের নিচে নেমে আসেন। ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। পুলিশ ঘটনাস্থলের উত্তর পাশের রান্নাঘরের কাছ থেকে মালেকের দগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করে। ফারুককে পরে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ৫ মার্চ জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। 
যোগাযোগ ও টাকা লেনদেন
তদন্তে মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড ও মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনের তথ্যও পর্যালোচনা করা হয়েছে। 
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, জাহিদুল ঘটনার আগে মালেক ও ফারুকের নম্বরে একাধিক দফায় টাকা পাঠান। ঘটনার দিনও তাদের নম্বরে টাকা পাঠানোর তথ্য পাওয়া গেছে। ঘটনার পর আশরাফুলের সঙ্গে জাহিদুল নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। আশরাফুলের জবানবন্দি অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে জাহিদুল তাকে ছয়-আট লাখ টাকা দিয়েছেন। 



শেয়ার করুন:
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
অবশেষে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন থালাপতি বিজয়

অবশেষে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন থালাপতি বিজয়