ঢাকা | বঙ্গাব্দ

প্রকৌশলী মাহমুদুলের লুটপাটে ছিন্নভিন্ন সিরাজগঞ্জ গণপূর্ত!

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 23, 2026 ইং
প্রকৌশলী মাহমুদুলের লুটপাটে ছিন্নভিন্ন সিরাজগঞ্জ গণপূর্ত! ছবির ক্যাপশন: সিরাজগঞ্জ গণপূর্তে টেন্ডার বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসান
ad728
নিজস্ব প্রতিবেদক:
নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসানের অপ্রতিরোধ্য লুটপাটে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন সিরাজগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগ। ডিভিশনটিতে লুটপাটের অলিখিত অঘোষিত স¤্রাটে পরিণত হয়েছেন তিনি। সেখানে তিনি নিজ হাতে নিয়ন্ত্রণ করছেন ‘সিন্ডিকেট সাম্রাজ্য’। সরকারি ইজিপি ও আইবাসের মতো স্পর্শকাতর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম  নিজের লুটপাটের সুবিধার্থে বহিরাগত ব্যক্তিকে দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করছেন। এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বিভাগটির নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে। 
অনুসন্ধানে জানা যায়, তাঁর প্রত্যক্ষ মদদে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বিল-ভাউচার প্রক্রিয়াকরণ, কমিশন বাণিজ্য, ঠিকাদার সিন্ডিকেট গঠন এবং আর্থিক অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার লুটপাট সংঘটিত হচ্ছে। সম্প্রতি জনৈক আরিফ নামের এক ব্যাক্তি দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন আইে প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর অভিযোগ, সরকারি বিধি-বিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিভাগটির নির্বাহী প্রকৌশলী নিজের আস্থাভাজন বহিরাগতদের দিয়ে পরিচালনা করাচ্ছেন ইজিপি ও আইবাসের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম। ফলে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনা ও টেন্ডার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। 
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহমুদুল হাসানের ইজিপি ও আইবাস আইডির পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে অফিসে বসেই টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ওয়ার্ক অর্ডার আপলোড, বিল এন্ট্রি এবং আর্থিক নথি প্রক্রিয়াকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর কাজ করছেন আউটসোর্সিং এক কর্মচারী। অথচ সরকারি বিধি অনুযায়ী এসব কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক কর্মকর্তাদের। হিসাব শাখাকে কার্যত অকার্যকর করে দিয়ে পুরো আর্থিক বিষয়াদি নিয়ন্ত্রণ ও  কুক্ষিগত করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী। তাঁর বিশ্বসন্থ ‘ক্যাডার’ হিসেবে পরিচিত আনোয়ার দীর্ঘদিন ধরেই এই অনিয়মের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন। তিনি অন্য সব স্থানে দায়িত্বে থাকাকালেও একই কৌশলে আনোয়ারকে ব্যবহার করেছেন এই নির্বাহী প্রকৌশলী। পরে সিরাজগঞ্জে বদলি হয়ে আসার সময় তাকেও সঙ্গে নিয়ে আসেন লুটপাটে বুদ মাহমুদ। 
অভিযোগকারীরা বলেছেন, সরকারি কর্মকর্তা হয়েও বাস্তবে ঠিকাদারি সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন নির্বাহী প্রকৌশলী  মাহমুদুল হাসান। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত কথিত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ‘এসএ এন্টারপ্রাইজ’ এর মাধ্যমে বিভাগটির অধিকাংশ লাভজনক কাজ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এই এস এ এন্টারপ্রাইজের নামে তিনিই করছেন ঠিকাদারী ব্যবসা।
নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ডিভিশনের বিভিন্ন প্রকল্পে বড় কাজগুলো এই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এককভাবে করছে নিরর্বাহী প্রকৌশলীর আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে। অন্য ঠিকাদারদের কাজ নিতে হলেও ওই প্রতিষ্ঠানে সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন এই নির্বাহী প্রকৌশলী। ঠিকাদারদের কমিশনের মোটা অংশ চলে যায় প্রভাবশালী ওই চক্রের পকেটে। অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ ঠিকাদারদের কোটি কোটি টাকার বিল বছরের পর বছর ঝুলে থাকলেও সিন্ডিকেঁভূক্ত ঠিকাদারদের বিল অস্বাভাবিক দ্রুততায় পরিশোধ করা হচ্ছে নিয়মিত। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ও শেষধাপে উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে মোটা অঙ্কের টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অনিয়মের মাত্রা এতোটাই ভয়াবহ যে, গত অর্থবছরে বাস্তবায়নকৃত কাজ চলতি অর্থবছরের এপিপিতে (বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, পরিকল্পিতভাবে সিন্ডিকেঁভূক্ত ঠিকাদারদের আর্থিক সুবিধা দিতেই এ ধরনের অনিয়ম করা হয়েছে।
গণপূর্ত বিভাগজুড়ে ‘লুটপাট সিন্ডিকেট’: অভিযোগ উঠেছে, নির্বাহী প্রকৌশলীর নেতৃত্বে বিভাগটিতে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী দুর্নীতি ও লুটপাটের সিন্ডিকেট। এতে নির্বাহী প্রকৌশলীর পাশাপাশি কয়েকজন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই), বহিরাগত ব্যক্তি এবং হাতেগোনা কয়েকজন প্রভাবশালী ঠিকাদার জড়িত রয়েছেন। বিশেষ করে এক এসডিই নির্বাহী প্রকৌশলীর বরাদ দিয়ে ঘুষ বাণিজ্য ও কমিশন আদায়ের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন একাধিক স্থানীয় ঠিকাদার। তাদের দাবি, বিল ছাড়, কাজ অনুমোদন ও অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রমে নির্দিষ্ট ‘পার্সেন্টেজ’ ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না এই দপ্তরে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ঠিকাদারের অভিযোগ, বিভিন্ন অভিযোগ বা অনুসন্ধান ধামাচাপা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হচ্ছে ঠিকাদার ও অধিনস্থ প্রকৌশলীদের কাছ থেকে। দুদক, গোয়েন্দা সংস্থা ও সাংবাদিকদের ‘ম্যানেজ’ করার কথা বলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে প্রকৌশলী মাহামুদুল হাসানের বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিভাগের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ঘুরেফিরে একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ পাচ্ছে। ফলে সাধারণ ঠিকাদাররা কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। সিরাজগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের উন্নয়নকাজের প্যাকেজ বিভাজন, ঠিকাদার নির্বাচন ও বিল পরিশোধ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে প্রায় সোয়া কোটি টাকার বিভিন্ন কাজ ৩৭টি ছোট প্যাকেজে ভাগ করে আরএফকিউ করে নামকাওয়াস্তে বাস্তাবয়ন দেখিয়ে লুটপাট ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়েছে লুটেরা মাহামুদুল হাসানের নেতৃত্বে। 
পাশাপাশি নির্দিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বারবার কাজ দেওয়ার সুযোগ তৈরী ও কাজের পরিমাণের সঙ্গে বিল পরিশোধে অসঙ্গতির অভিযোগও করেছেন একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। জানা গেছে, ২০২৩ সালের নভেম্বরে সিরাজগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে মাহমুদুল হাসান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কাজ বণ্টনের ক্ষেত্রে কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বেড়েছে। 
স্থানীয় কয়েকজন ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেও একই ধরনের অভিযোগের কথা জানা গেছে
২০২৪ ও ২০২৫ সালের জুন ক্লোজিংকে কে›ন্দ্র করে প্রায় ৩ কোটি টাকা বিল-ভাউচারের মাধ্যমে পরিশোধের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে বান্তবে যতটুকু কাজ হয়েছে, তার সঙ্গে বিলের সামঞ্জস্য নেই। ‘বাবর অ্যাসোসিয়েটস’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ নিয়েও ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির কার্যাদেশ, কাজের অগ্রগতি, পরিমাপ বই এবং বিল পরিশোধের নথি যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে বিশেষ সুবিধা ভোগ করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী গোপালগঞ্জ নিবাসী মো. মাহমুদুল হাসান। দীর্ঘ চাকরি জীবনে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি ঢাকার বনশ্রীতে দু’টি বিলাশবহুল এপার্টমেন্ট, পূর্বাচলে প্লট, গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে ফিলিং স্টেশনসহ বিভিন্ন ধরণের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ নামে-বেনামে বিপুল সহায়-সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধানে মিলবে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিশাল সম্পদ।
এসব অভিযোগের বিষয়ে ফোনে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহমুদুল হাসান এ বিষয়ে কোন কথা কলবেন না বলে জানিয়ে দেন।  (ক্রমশ:)) 



শেয়ার করুন:
কমেন্ট বক্স
বিদায়ী ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা কেবল ক্ষমতা হস্তান্তর নয় গণতন্ত

বিদায়ী ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা কেবল ক্ষমতা হস্তান্তর নয় গণতন্ত