ঢাকা | বঙ্গাব্দ

গণহত্যায় অর্থদাতা গণপূর্ত প্রকৌশলী ইলিয়াস ধরাছোঁয়ার বাইরে!

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 12, 2026 ইং
গণহত্যায় অর্থদাতা গণপূর্ত প্রকৌশলী ইলিয়াস ধরাছোঁয়ার বাইরে! ছবির ক্যাপশন: পর্ব-(১)ঃ স্বৈরাচারের আত্মীয় গণপূর্ত সিলেট সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইলিয়াস আহমেদের বিরুদ্ধে বেনামে ঠিকাদারী ব্যবসাসহ বিবিধ অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে প্রায় হাজার কোটি টাকার সহায়-সম্পদ অর্জনের অভিযোগ
ad728
জয়নাল আবেদীন যশোরী ও আসাদ মাহমুদ:
নিষিদ্ধ ঘোষিত ২৪ এর জুলাইয়ে ছাত্র-জনতা হত্যাকারী ছাত্রলীগের একনিষ্ঠ ও চিহ্নিত ছাত্রলীগের কর্মীরা এখনো প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা তাদের স্থান থেকে পতিত আ’লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়নের ষড়যন্ত্র করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ রকম চিহ্নিত পরীক্ষিত ও আত্মস্বীকৃত ছাত্রলীগ কর্মী গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. ইলিয়াস আহম্মেদ। তিনি ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সদস্য হয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে লাগাতার অনিয়ম ও দুর্নীতি করে কামিয়েছেন প্রায় হাজার কোটি টাকা। এই অবৈধ টাকার সামান্য অংশ তিনি জুলাইয়ের ছাত্র-জনতা হত্যা করার জন্য তার দল ছাত্রলীগের কর্মীদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। গণহত্যায় আর্থিক সহায়তা করার জন্য তার বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলাও দায়ের হয়েছে। কিন্তু এতোকিছুর পরেও তিনি রয়েছেন বহাল তবিয়তে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের সিলেট সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে এখনো দাপটের সাথেই চাকুরি করে যাচ্ছেন মহাঘুষখোড় সরকারী বরাদ্দ লুটপাটের দস্যু ইলিয়াস আহমেদ। গণপূর্ত অঙ্গনে জনশ্রুতি আছে, আ’লীগ প্রধানের দেশে ফিরিয়ে আনতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ যুবলীগ কর্মীদের মাধ্যমে আবারও বিনিয়োগ করছেন কয়েক কোটি টাকা। তিনি স্বৈরাচার আ’লীগের সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী স ম রেজাউল করিমের আত্মীয় হিসাবে পরিচিত। তিনি মন্ত্রী থাকতে গণপূর্ত অধিদপ্তরে পোস্টিং পদোন্নতিসহ সকল ধরণের কার্যক্রমে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করেছেন প্রকৌশলী ইলিয়াস। বর্তমানে গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী জনাব আহম্মদ সোহেল মনজুরের নিকটাত্মীয় পরিচয় দিয়ে নব্য জাতীয়তাবাদের জিকির তুলে নিজেকে আড়াল করার প্রাণপন চেষ্টা করছেন এই ধুরন্ধর গণপূর্ত কর্মকর্তা। তথ্য সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের।   
মো. ইলিয়াস আহম্মেদের ছাত্রলীগ ও আ’লীগের সাথে গভীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ হিসেবে তার সোশ্যাল মিডিয়ার একাউন্টের কিছু স্ক্রিনশট এসেছে বাঙালি সংবাদের কাছে।  ছবিগুলো তার ব্যক্তিগত ফেইসবুক প্রোফাইল থেকে ইতোপূর্বে  নেওয়া হয়েছে। ২৪ এর আগস্টের পরেও তা ছিলো প্রকৌশলী ইলিয়াসের ফেসবুক প্রোফাইলে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হওয়ার পরে ওই সকল পোস্টগুলো তিনি ডিলিট করে ফেলেছেন। একটি স্ক্রিনশট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০ সালে আনিসুজ্জামান ইমন নামে এক প্রকৌশলী নিজের ফেইসবুকে পোস্ট করে জনতার কাছে একটি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলেন। প্রশ্নটি ছিল "ছাত্রলীগ করাই কি আজন্ম পাপ?” সেই পোস্টে মন্তব্য করতে গিয়ে ইলিয়াস আহমেদ নিজেকে আওয়ামী আদর্শের দাবী করেন। তিনি আরও বলেন, আদর্শ বিচ্যুত হন না বলেই নাকি উপর মহল তাকে (সাবেক ছাত্রলীগ) ভালো কর্মকর্তার স্বীকৃতি দেয়নি।
ভালো কর্মকর্তার স্বীকৃতি না পেয়েও ইলিয়াস আহম্মেদ গণপূর্ত অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করে গেছেন প্রভাব বিস্তার করে। বিগত আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আসার সাথে সাথেই তিনি নারায়নগঞ্জ থেকে বদলী হয়ে ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগের রমনা-১ উপবিভাগে বদলি হয়ে আসেন। গণপূর্তে কথিত আছে যে তিনি তৎকালীন পূর্ত প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট মান্নান খানের ডান হাত খ্যাত ইকবালকে কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে রমনা-১ এর সাব-ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার (এসডিই) হয়ে বদলি হন। এরপর আওয়ামী নেতা মৃনাল কান্তির হাত ধরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে প্রথমেই মহাখালী গণপূর্ত বিভাগে পোষ্টিং বাগিয়ে নেন। সেখান থেকে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের মন্ত্রিত্বকালে ঢাকা বিভাগ-২ এর পোস্টিং বাগিয়ে দখল নেন ইলিয়াস। অভিযোগ রয়েছে তিনি মোশাররফের এপিএস নুর খান এর সাথে ব্যাপক সখ্যতা গড়ে তুলে কয়েক কোটি টাকার বিনিময়ে সেই পোস্টিং বাগিয়ে নিয়েছিলেন। 
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা বিভাগ-২ এ ব্যাপক অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা বকেয়া করায় ২০১৬ সালে তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান মুন্সী তাকে দূর্নীতির দায়ে নড়াইলে শাস্তিমূলক বদলী করেন। পরবর্তীতে মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী হলে ২০১৭ সালে তাকে আবার ঢাকা ডিভিশন-২ এ বদলি করে আনেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তৎকালীন ডিজি অ্যাডমিন কবির বিন আনোয়ারের সাথে নিবির সম্পর্ক গেড়ে তোলেন তিনি। দু’জনে এক সাথে দেশ-বিদেশে বিভিন্ন উপলক্ষ্যে প্রমোদ ভ্রমনে গিয়েছেন এ রকম বহু তথ্যচিত্র রয়েছে বাঙালি সংবাদের কাছে। কিন্তু ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি আর লুটপাটের কারণে এসএসএফ এর তৎকালীন ডিজি ওই সময়ে প্রকৌশলী ইলিয়াসকে পিএম অফিস ও গণভবনে ঢোকার অনুমতি দেয়নি। পরে আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগে আবাসিক ভবন নির্মাণের জন্য কয়েক হাজার কোটি টাকার কাজ আসলে তিনি নিজ ইচ্ছায় সেখানে বদলী হন। আজিমপুর ডিভিশনে নিয়ম বহির্ভুতভাবে তিনি টানা ছয় বছর থেকে তিনটি ফেজে প্রকল্পের টেন্ডার বাণিজ্যের একক নিয়ন্ত্রণ হাতিয়ে নিয়েছিলেন প্রকৌশলী নামের জনঅর্থ লুটের দস্যু বা ডাকাত ইলিয়াস। বিল দিয়েছেন প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার। 
আরো জানা যায়, আজিমপুর গণপূর্তে থাকাকালীন তিনি সাবেক পূর্ত সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকারের সাথে নিবির সখ্যতা গড়ে তুলেন। এক পর্যায়ে ওইগোপালী সচিবে আমোদ-প্রমোদের সাপ্লাইয়ার বনে যান এই প্রকৌশলী। এমনকি শেরে বাংলা নগরে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত শহীদুল্লাহ খন্দকারের ছেলের বিয়েতে সমস্ত খরচ ইলিয়াস বহন করেছেন মর্মে জনশ্রুতি রয়েছে। ইলিয়াসের ব্যবস্থাপনায় সকল গণপূর্ত প্রকৌশলীদের দাওয়াত করে ওই বিয়েতে দুই বস্তা স্বর্নের গহণা গিফট করা হয়। আর এজন্য ভরা মাহফিলে শহীদুল্লাহ খন্দকার ইলিয়াসের প্রশংসাও করেছেন। এ সময় তার বিরুদ্ধে মূল ধারার একাধিক গণমাধ্যমে ধারাবাহিক দুর্নীতির অভিযোগ আসলেও ওই সচিবের ছায়ায় রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে তিনি বহালতবিয়তে ছিলেন। 
এছাড়াও সেই সময় জিকে শামীম কান্ডে দুদকে অভিযুক্ত ছিলেন প্রকৌশলী ইলিয়াস। দুদকের অনুসন্ধান থেকেও বিপুল পরিমাণ টাকা ঘুষ দিয়ে নিজের নাম প্রত্যাহার করেছেন বলেও অভিযোগ আছে।
আরো অভিযোগ আছে যে, তিনি ২০১৮ সালে সরাসরি পিরোজপুরের শ ম রেজাউল করিমের জনসভায় যোগ দিয়েছিলেন তার সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারনায় অংশ নিতে। সেই সব প্রচারনার ছবিও তিনি তার ব্যক্তিগত ফেইসবুক প্রোফাইলে সে সময়ে শেয়ার করেছিলেন। একইভাবে তিনি শাহে আলম মুরাদের নির্বাচনী প্রচারনায়ও বিপুল অর্থ দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ. ফ. ম বাহাউদ্দিন নাসিম, আব্দুর রহমান, শ ম রেজাউল করিম, শরীফ আহমেদ সহ ডজন খানেক আওয়ামী নেতার নির্বাচনে তিনি কাড়ি কাড়ি অর্থ ঢেলেছেন বলে অভিযোগ আছে।
তার আরেকটি ফেইসবুকের ছবিতে তিনি সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আব্দুর রহামানকে নিজের অভিভাবক হিসেবে দাবি করেছেন। ছবিতে দেখা যায় তিনি স্বশরীরে আব্দুর রহমানকে ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের নিজস্ব সিন্ডিকেট সহকারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা জানানোসহ সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী আবুল হোসেনের মৃত্যুতেও গভীর শোক জানিয়েছেন তার ব্যক্তিগত সোশ্যাল মিডিয়াতে।
অভিযোগ রয়েছে মেয়েকে কানাডায় উচ্চশিক্ষায় ভর্তি করিয়ে অফশোর ব্যাঙ্কিং এর মাধ্যমে কানাডার বেগমপাড়ায় বিপুল সম্পত্তি ক্রয় করেছেন। তিনি অবৈধ অর্থের জোরে অত্যন্ত বিলাসী জীবন-যাপন করেন। তিনি ধানমন্ডির আবাহনী ক্লাব, অফিসার্স ক্লাব, ঢাকা ক্লাব, গুলশান ক্লাব, বনানী ক্লাবসহ ঢাকার বিলাসবহুল ক্লাবের অভিযাত সদস্য। ওই সকল জায়গায় রঙ্গিন পানীয়তে মসলিস সাজিয়ে বন্ধু-বান্ধবীদের নিয়ে উষ্ণ আনন্দে গা ভাসিয়ে দেশ-বিদেশে প্লেজার ট্রিপের চিল্লা করার প্ল্যানিং সাজান বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়।
আরো জানা যায়, ওই সময়ে প্রকৌশলী ইলিয়াসের অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়ে কেউ মুখ খুললে তাকে বিভিন্নভাবে নাজেহাল করা হতো। এমনকি সন্ত্রাসীদের দিয়ে শায়েস্তা করা হতো। জনৈক পল্টন দাস নামের এক ঠিকাদার প্রকৌশলী ইলিয়াসের অনৈতিক কর্মকান্ড ও লুটপাটের বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী কাছে লিখিত অভিযোগ দেয়ার কারণে তার লাইসেন্সকে ব্ল্যাকলিষ্টেড করাসহ গণপূর্তে কোথাও কাজ করতে না দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন ইলিয়াস। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা সহ বিভিন্নভাবে তাকে নাজেহাল করে ওই আবেদন তিনি করেননি এমন একটি চিঠি লিখে সেখানে জোড় জবরদস্তি করে পল্টন দাসের স্বাক্ষর নিয়ে নেন প্রকৌশলী ইলিয়াস। এছাড়াও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন লোককে তিনি সন্ত্রাসী লেলিয়ে দিয়ে শায়েস্তা করেছেন বলে ওই সময়ে বন্ধু মহলে বলে বেরিয়েছেন তিনি।  
এ সকল বিষয়ে মো. ইলিয়াস আহম্মেদের মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। এমনকি ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি কোন উত্তর দেননি। (ক্রমশঃ) 



শেয়ার করুন:
কমেন্ট বক্স
জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে সোমবার নিউইয়র্ক যাচ্ছেন প্রধানমন্ত

জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে সোমবার নিউইয়র্ক যাচ্ছেন প্রধানমন্ত