আসাদ মাহমুদ ও আলমগীর হোসেন:
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) যেন এখন এক ফ্যাসিবাদের প্রকাশ্য মগের মুল্লুক। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর পুরো দেশে যখন সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের চেষ্টা চলছে, তখন এসআরডিআই’তে বিপ্লবী শহীদদের রক্তের সাথে বেঈমানি করে ‘ভোল পাল্টানো’ ফ্যাসিস্টদের পুনর্বাসন নানা অপকর্ম চলছে তড়িৎ গতিতে। নতুন মহাপরিচালকের একের পর এক তুঘলকি সিদ্ধান্তের কারণে দপ্তরটিতে চলছে অনিয়ম দুর্নীতি আর লুটপাটের মহোৎসব। ৪ আগস্ট খুনি সরকারের পক্ষে রাজপথে শান্তি সমাবেশে নেতৃত্ব দেওয়া ফ্যাসিবাদের দোসররাই এখন প্রকাশ্য দিবালোকে রাতারাতি ‘বিএনপি সেজে’ বর্তমান ডিজিকে ঘিরে রেখেছে। দায়িত্ববান কর্মনিষ্ঠ ও বিপ্লবের পক্ষের কর্মকর্তাদের বদলি ও হয়রানি করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিতে যেন বিগত স্বৈরাচারী আমল ‘জুলাইয়ের’ জুলুম অত্যচার নির্যাতন যেন আবারও বীরদর্পে ফিরে এসেছে।
পরিকল্পনা সেল বিলুপ্ত করে ফারুককে সরিয়ে দুর্নীতিবাজ সিরাজীকে অলিখিত দায়িত্ব প্রদান: এসআরডিআই-এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে ‘পরিকল্পনা বিভাগ বা উইং’ নামে কোনো অনুমোদিত সেকশন না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে মহাপরিচালক কর্তৃক গঠিত একটি বিশেষ ‘পরিকল্পনা সেল’ বিভিন্ন প্রকল্প ও উন্নয়ন কর্মসূচি প্রণয়নসহ কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাথে সার্বিক যোগাযোগ রক্ষা করে আসছিল। সর্বশেষ এই গুরুত্বপূর্ণ সেলের দায়িত্বে দক্ষতার সাথে কাজ করছিলেন নিষ্ঠবান বিএনপিপন্থী কর্মকর্তা জনাব মোঃ ফারুক হোসেন। কিন্তু গত ২৩ মে ২০২৬ তারিখে নতুন মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ডঃ আফসার আলী অনিয়ম দুর্নীতির নতুন দরজা খুলে বসেছেন। তিনি সুকৌশলে এই পরিকল্পনা সেলটি সম্পূর্ণ ভেঙে দেন। ফারুক হোসেনকে সরিয়ে তিনি আরেক চিহ্নিত ফ্যাসিস্ট দোসর হুমায়ুন কবির সিরাজীকে এই সেলের অলিখিত প্রধান বানিয়ে সকল প্রকল্পের ভাগ্য নির্ধারণের দায়িত্ব শপে দিয়েছেন। অথচ এই সিরাজী বর্তমানে যশোরে পোস্টিং হওয়া সত্তে¡ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের আদেশের প্রতি কোন তোয়াক্কা না করে ডিজি তাকে অননুমোদিতভাবে ঢাকায় এনে নিজের স্বার্থে অনৈতিক লাভের জন্য তাকে দিয়ে দিনের পর দিন কাজ করাচ্ছেন।
প্রকৃতপক্ষে, প্রধান কার্যালয়কে ৪ আগস্টের শান্তি সমাবেশে অংশ নেওয়া ফ্যাসিস্ট ও সাবেক ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নেতাদের মিলনমেলায় পরিণত করা হয়েছে। বর্তমানে ডিজিকে সার্বক্ষণিক বেষ্টন দিয়ে আগলে রাখেন আমীর জাহিদ, মামুনুর রহমান, হুমায়ুন কবির সিরাজী, রতন, এনায়েতুল্লাহ ও শরিফুল ইসলামের মতো চরম বিতর্কিত ও দুর্নীতিগ্রস্থ লুটেরা কর্মকর্তারা।

ল্যাব প্রতিষ্ঠার আগেই ভারতীয় কনসালট্যান্টকে দিয়ে ৫৪ লাখ টাকা লোপাট, ফাইলের ডকুমেন্ট গায়েবকারী সিরাজীর পুনর্বাসন মিশন:
যশোর আঞ্চলিক কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. হুমায়ুন কবির সিরাজী আওয়ামী আমলে নবসৃষ্ট গবেষণাগারের কর্মসূচি পরিচালক থাকাকালীন ব্যাপক দুর্নীতি আর লুটপাটে জড়িয়ে পড়েন। তিনি তৎকালীন মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের ডিও লেটার নিয়ে সাবেক কৃষি মন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকের সরাসরি আনুকূল্যে বাগিয়ে নেন। পরবর্তীতে Accreditation Lab-এর কাজ দেখাশোনার নামে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম করে বড় অংকের টাকা লোপাট করেন তিনি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এখনও পর্যন্ত এক্রিডিটেশন ল্যাব প্রতিষ্ঠা লাভই করেনি। অথচ কাগজ-কলমে জালিয়াতি করে ভারতীয় এক কনসালট্যান্টকে ৫৪ লাখ টাকা পরিশোধ দেখিয়ে বেশীরভাগ টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এই একরিডিটেশন ল্যাবের দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে সিরাজী সমস্ত ফাইলের ভিতরের গুরুত্বপূর্ণ মূল কাগজপত্র ও প্রমাণাদি সরিয়ে ফেলেন। সরকারি চাকুরির বিধিমালা অনুযায়ী এটি চরম ফৌজদারি অপরাধ হওয়া সত্তে¡ও বর্তমান ডিজি তাকে কোনো শাস্তি না দিয়ে উল্টো মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবের এক্রিডিটেশনের নতুন বাড়তি দায়িত্ব দিয়ে পুরস্কৃত করতে যাচ্ছেন।

নবম গ্রেডের শরিফুলের ‘মহাদাপটে’ পাজেরো রাজত্ব ও ৪র্থ গ্রেডের ফাইল নিয়ন্ত্রণ:
পাবলিকেশন এন্ড লিয়াজোঁ অফিসার নবম গ্রেডের কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে বিলাসবহুল পাজেরো গাড়ি (নম্বর: ঢাকা মেট্রো ঘ-১৩-৭৮৪৬) হাঁকিয়ে প্রতিদিন অফিসে আসছেন। কোনো দাপ্তরিক অনুমোদন ছাড়াই সম্পূর্ণ অবৈধভাবে এই গাড়িটি তার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সাবেক আওয়ামী কেবিনেট সচিব ও এমপি সাজ্জাদুল হাসানের এই ঘনিষ্ঠ দোসর ৫ই আগস্টের পর রাতারাতি ভোল পাল্টে রাজনৈতিক জার্সি ত্যাগ করে পিএসসির একজন সম্মানিত সদস্যের নাম ভাঙিয়ে দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছেন গোটা এসআরডিআই। সংস্থায় বর্তমানে এমন হ-য-ব-র-ল চলছে যে ডিজির নিকট কোনো ফাইল উত্থাপনের পূর্বে চতুর্থ বা ষষ্ঠ গ্রেডের ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা স্বাক্ষর করার পর, ডিজি সেই ফাইল ‘উপ-পরিচালক (প্রশাসন)’-কে না দিয়ে সরাসরি জুনিয়র শরিফুলের কাছে তার ‘মতামত’ ও অনুমোদনের জন্য পাঠান! উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ফাইল নবম গ্রেডের কর্মকর্তার টেবিল ঘুরে আসার এই চরম অবমাননাকর নিয়মে জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানীরা লজ্জিত বিব্রত নির্যাতিত বোধ করছেন।

বৈষম্যের শিকারদের ওপর জুলুম: বিএনপিপন্থীদের গাড়ি বন্ধ, ডিজির দখলে ৩টি গাড়ি:
বর্তমান ডিজি ডঃ আফসার আলী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই এক চোখা নির্যাতন নিস্পেষনের নীতি গ্রহণ করেছেন। ডিজির রোষানলে পড়ে ডাইনামিক কর্মঠ ও বিএনপিপন্থী কর্মকর্তা উপ-পরিচালক (প্রশাসন)-এর অফিশিয়াল গাড়ি বন্ধ করে দিয়েছেন। এমনকি প্রতিহিংসার বসবর্তী হয়ে সয়েল কেমিস্ট্রি শাখার গাড়িটিও অজ্ঞাত কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী দোসর নবম গ্রেডের কর্মকর্তা শরিফুল পাজেরো গাড়ি হাঁকিয়ে বেড়াচ্ছেন দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছেন এসআরডির সদর থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলো।
শুধু তাই নয়, নিজের পরিবারের রাজকীয় বিলাসিতার জন্য ডিজি ডঃ আফসার আলী নিয়ম বহির্ভূতভাবে সার্বক্ষণিক ২ থেকে ৩টি সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে চলেছেন। যা চরম ক্ষমতার অপব্যবহার।
অল্পদিনে গুণধর ফ্যাসিবাদ ডিজির যত ‘মহান’ কৃতিত্ব: গত ২৩ মে ২০২৬ তারিখে যোগদানের পর এই বাসদ নেতা এসআরডিআই-কে এক নিরাপদ ফ্যাসিস্ট পুনর্বাসন কেন্দ্রে পরিণত করেছেন। তার সংক্ষিপ্ত আমলের মূল কৃতিত্বসমূহ:
ক্ষমতার অপব্যবহার: নিজ এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে ৪র্থ গ্রেডের (সুনামগঞ্জের) কর্মকর্তা আমিনুল ইসলামকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে প্রেষণে ঢাকায় ন্যস্ত করেছেন।
শাস্তিমূলক বদলির চক্রান্ত: বৈষম্যের শিকার কর্মকর্তাদের ঢাকায় পদায়ন না করে উল্টো ৫ আগস্টের পর যারা যোগ্যতাবলে ঢাকায় পদায়ন পেয়েছিলেন, তাদের শাস্তিমূলক বদলি করার চক্রান্ত চালাচ্ছেন ডিজির ফ্যাসিবাদ সিন্ডিকেট।
৬৩ স্টাফের চুক্তি বাতিল : কোনো পূর্বপরিকল্পনা ও প্রস্ততি ছাড়াই ইনস্টিটিউটের ৬৩ জন আউটসোর্সিং স্টাফের ২ বছর মেয়াদি বৈধ চুক্তি বাতিল করেছেন, যার ফলে ল্যাব ও মাঠ জরিপের কাজ সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে।
খুনির দোসরদের নিয়ে কমিটি: কারিগরি রিপোর্ট প্রকাশের জন্য একটি বিতর্কিত কমিটি গঠন করেছেন যার প্রধান করা হয়েছে ৪ আগস্টের শান্তি সমাবেশের অন্যতম খলনায়ক আমীর মো. জাহিদকে (যার থলিতে আছে প্রেসনের নামে সরকারি টাকা লোপাট, ডিগ্রী না নিয়ে এক দশক পার) এবং সদস্য সচিব করা হয়েছে কেয়া কর্মকারকে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলো আওয়ামী দোসর এনায়েতুল্লাহ ও ফ্যাসিস্ট মামুনুর রহমান (যার বিএনপি-বিদ্বেষী অডিও ক্লিপ ভাইরাল)।
লুটপাটের রাস্তা পরিষ্কার: যানবাহন কর্মকর্তার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে নিষ্ঠবান বিএনপিপন্থী কর্মকর্তাকে সরিয়ে মহাপরিচালক তার নিজস্ব সিন্ডিকেটের লুটপাটের রাস্তা ফাঁকা ও পরিষ্কার করেছেন।

মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ জরুরি
বর্তমানে ঢাকা অফিসকে ৪ঠা আগস্টের শান্তি সমাবেশে অংশ নেওয়া ফ্যাসিস্ট ও সাবেক ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নেতাদের মিলনমেলায় পরিণত করা হয়েছে। ডিজিকে সার্বক্ষণিক বেষ্টন করে থাকে আমীর জাহিদ, সিএসও মামুনুর রহমান, হুমায়ুন কবির সিরাজী, রতন, এনায়েতুল্লাহ ও শরিফুল ইসলামের মতো চরম বিতর্কিত ও দুর্নীতিগ্রস্থ লুটেরা চরিত্রহীন কর্মকর্তারা।
সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা, ২০১৯ এবং শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা, ২০১৮-কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে এই একদল কর্মকর্তা দূরবর্তী গবেষণাগারে পোস্টিং নিয়ে ও কোনো অনুমোদন ছাড়াই ঢাকায় অবস্থান করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের পোস্টিং ফেলে ঢাকায় ডিজির উপদেষ্টা সেজে বসে আছেন। আড্ডা দিচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি ও কার্যকারিতা রক্ষা করতে অবিলম্বে এই পাজেরো সিন্ডিকেট ও ডিজি আফসার আলীর বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন এবং ছাঁটাইকৃত ৬৩ জন কর্মীকে পুনর্বহাল করার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বর্তমান সরকারের কঠোর হস্তক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। (ক্রমশ:)