বিশেষ প্রতিবেদক
বঙ্গবন্ধু পরিষদ নেতা মজিবর রহমানের বেপরোয়া লুটপাট আর লাগাতার ঘুষ/কমিশন বাণিজ্যের কারণে দেউলিয়া হওয়ার পথে জনতা ব্যাংক। ৩ হাজার কোটিরও বেশি টাকা লোকসান করানো এই শীর্ষ কর্মকর্তার ক্রম বর্ধমান অনিয়ম আর দুর্নীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা। তার বিরুদ্ধে পোষ্টিং পদোন্নতি নিয়োগ ঋণ অনুমোদন সুদ মওকুফ, পূণঃ তফশীলকরণ টেন্ডার খাতে ব্যাপক দুর্নীতির আশ্রয় নেয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তথ্য নির্ভরযোগ্য সূত্রের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৬৯ সালে ময়মনসিংহের হাসাদিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া মজিবর রহমান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে ব্যাংকিংয়ে এসেছিলেন। ১৯৯৮ সালে রূপালী ব্যাংকে যোগ দিয়েই জড়িয়ে পড়েন ‘বঙ্গবন্ধু কৃষিবিদ সংগঠন’-এর সাথে। দলীয় একান্ত আনুগত্যের পুরস্কারস্বরূপ সবাইকে ডিঙিয়ে ডিজিএম থেকে সবার আগে জিএম পদে পদোন্নতি বাগিয়ে নেন। ২০১৯ সালে ছিলেন রূপালী ব্যাংক বঙ্গবন্ধু পরিষদের ৪ নম্বর ক্রমিকে থাকা প্রতাপশালী শক্তিমান উপদেষ্টা। একটা সময় নিজেকে ‘আওয়ামী লীগ পরিবারের লোক’ এবং ‘এস আলম’ গ্যাংয়ের বিশ্বস্থ সহযোগী/অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি গর্ববোধ করতেন। অথচ আজ ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের পর নিজের চেয়ার বাঁচাতে ও সকল অপকর্ম লুকাতে তিনি গিরিগিটির ন্যায় রাতারাতি রং পাাল্টিয়ে খাটি জাতীয়তাবাদী সেজে ছাত্র-জনতার রক্তের সাথে বেইমানী করছেন। ছাত্র-জনাতার ওই আন্দোলনকে ব্যঙ্গ করছেন। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক নির্যাতিত নিপীরীত এক কর্মকর্তা জানান, আ’লীগের আমলে ক্ষমতা দেখিয়ে চলেছে আর এখন বিএনপির নাম ভাঙ্গিয়ে গোটা জনতা ব্যংককে পেটের ভেতরে ঢুকিয়ে হজম করতে চাচ্ছেন। তার বিষয়ে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে আর্থিক বিপর্যয়ে পড়ে ব্যাংকটি অচিরেই দেউলিযা হবে।
ব্যাংকপাড়ায় এখন প্রকাশ্য গুঞ্জন, বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলকে ম্যানেজ করে প্রায় ৪৭ কোটি টাকা ঘুষের এক অবিশ্বাস্য চুক্তিতে মজিবর এই জনতা ব্যাংকের এমডি পদটি কিনে নিয়েছেন। সেই টাকা সুদ-আসলে উঠানোর জন্য তিনি কোমড় বেধে নেমে তিনি এখন দেউলিয়া বানাতে বসেছেন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই সরকারি ব্যাংকটিকে।
মজিবর রহমানের চরম অদক্ষতা ও লাগামহীন দুর্নীতির কারণে জনতা ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণ সম্পদ না হয়ে আজ গলার ফাঁসে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত এ ব্যাংকের ৭০ শতাংশেরও বেশি ঋণ এখন খেলাপি। এর পরিমান দিনকে দিন বাড়ছে। বিভিন্ন গণ-মাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে লোকসানের পরিমাণ ছিল ৩০৬৬ কোটি টাকা, যা সদ্য শেষ হওয়া ২০২৬ সালে সুদ খাতেই লোকসান দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার কোটির ওপরে! ফলে বছর শেষে জনতা ব্যাংকের লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকায়।
এখানেই শেষ নয়, চূড়ান্ত নিরীক্ষা শেষে এই নিট লোকসান ৫ হাজার কোটি টাকা, খেলাপি ঋণ ৭০ হাজার কোটি এবং মূলধন ঘাটতি ৬৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার ভয়াবহ পূর্বাভাস পাওয়া গেছে। মুনাফাতো দূরের কথা, ১০-১২ শতাংশ চড়া সুদে আনা সাধারণ মানুষের আমানত থেকেই এখন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করছে ব্যাংকটি।
একজন এমডি কতটা মরিয়া হলে গ্রাহককে ওপেন ব্ল্যাকমেইল করতে পারেন, তার প্রমাণ ‘ওরিয়ন ফার্মা’। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এই স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানটিকে ২ কোটি ৪১ লক্ষ টাকার একটি অগ্নি বীমা প্রকল্প জোরপূর্বক মজিবরের এক আত্মীয়ের ‘ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স’-কে দিতে বাধ্য করা হয়। ওরিয়ন এর অনিচ্ছা সত্ত্বেও জনতা ব্যাংক এমডি মজিবরের হুমকিতে অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা ডেবিটের চিঠি দিতে বাধ্য হয়েছিল কোম্পানীটি। এই এক ডিল থেকেই মজিবর একাই পকেটে ঢুকিয়েছেন ১ কোটি ৯ লাখ টাকার নগদ কমিশন! বাদবাকি বকশিশ ভাগ করে নিয়েছেন তার অন্ধ সহযোগী ৪৮ মতিঝিল শাখার দুর্নীতিগ্রস্থ ডিজিএম সোবাহান এবং এমডির সেই আত্মীয়।
আর্থিক এই বিপর্যয়ের মধ্যেও জনতা ব্যাংকে বিন্দুমাত্র সুশাসন ফেরেনি। গত ৭ ডিসেম্বর তড়িঘড়ি করে ২৬ জন কর্মকর্তাকে ডিজিএম পদে পদোন্নতি দেওয়া হয় মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে। সহকারী মহাব্যবস্থাপক থেকে এই পদোন্নতির ক্ষেত্রে মাথাপিছু ২০ থেকে ৩০লাখ টাকা করে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) টেবিলে জমা পড়েছে। ফিল্ড পর্যায়ের অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের কোনো মূল্যায়ন না করে, কোটি টাকার ঘুষের বিনিময়ে অদক্ষদের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার বানিয়ে পোস্টিং দেওয়া হচ্ছে। আর এই পুরো বদলি বাণিজ্যের ক্যাশিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন স্বয়ং এমডি মজিবুরের আপন ভায়রা ভাই! হয়রানিমূলক বদলির হাত থেকে বাঁচতে সৎ কর্মকর্তারা এখন নিজেদের জমানো টাকা ঘুষ দিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নীতি সহায়তা পাওয়া সৎ গ্রাহকদের পুন:তফশিল নিয়ে মজিবর গড়িমসি করছেন লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষের নীল নকশা বাস্তবায়নের আশায়। বর্তমান সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ও ব্যাংকিং সেক্টরকে লাভজনক করার রূপরেখার সামনে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বাঁধা জনতা ব্যাংকের এমডি মজিরর রহমান। বিষয়গুলো নিয়ে জনতা ব্যাংক এমডির দপ্তরে যোগযোগের চেষ্টা করেও কোন রেসপন্স না পাওয়ায় মতামত নেওয়া সম্ভব হয়নি। (ক্রমশঃ)